স্মরণ করো! তিনি দেখতে পেলেন একটি আগুন, তাই তিনি তাঁর পরিবারবর্গকে বললেন -- ''দাঁড়াও, আমি নিঃসন্দেহ একটি আগুন দেখছি, সম্ভবতঃ তোমাদের জন্য সেখান থেকে আমি জ্বলন্ত আঙটা আনতে পারব অথবা আগুনের কাছ থেকে কোনো পথনির্দেশ পেয়ে যাব।’’
''এই বলেঃ 'তাকে একটি সিন্দুকের মধ্যে রাখ, তারপর এটিকে পানিতে ভাসিয়ে দাও, তারপর নদী তাকে তীরে ভেড়াবে, তাকে নিয়ে যাবে আমার এক শত্রু ও তারও শত্রু।’’ আর আমি তোমার উপরে আমার তরফ থেকে ভালবাসা অর্পণ করেছিলাম, আর যেন তুমি আমার চোখের সামনে প্রতিপালিত হতে পার।
''চেয়ে দেখো! তোমার ভগিনী হেটে চলেছিল, তখন সে বললে -- 'আমি কি আপনাদের জন্য দেখিয়ে দেব তাকে যে এর ভার নিতে পারে?’’ ফলে তোমাকে আমরা ফিরিয়ে দিলাম তোমার মায়ের কাছে যেন তার চোখ জুড়ায় আর সে যেন পরিতাপ না করে। আর তুমি একটি লোককে মেরে ফেলেছিলে, তারপর আমরা তোমাকে মনঃপীড়া থেকে উদ্ধার করেছিলাম, আর আমরা তোমাকে পরীক্ষা করেছিলাম বহু পরীক্ষায়। এরপর তুমি বহু বৎসর অবস্থান করেছিলে মাদিয়ানবাসীদের সঙ্গে, তারপর, হে মূসা, তুমি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এসে পৌঁছেছ।
''সুতরাং তোমরা উভয়ে তার কাছে যাও এবং বলো -- 'আমরা তোমার প্রভুর বার্তাবাহক, তাই আমাদের সঙ্গে ইসরাইলের বংশধরদের পাঠিয়ে দাও, আর তাদের অত্যাচার করো না। আমরা নিশ্চয়ই তোমার কাছে এসেছি তোমার প্রভুর কাছ থেকে নির্দেশ নিয়ে। আর শান্তি তার উপরে যে পথনির্দেশ অনুসরণ করে।
''যিনি তোমাদের জন্যে পৃথিবীটাকে করেছেন একটি বিছানা, আর তোমাদের জন্য এতে ছড়িয়ে দিয়েছেন পথসমূহ, আর তিনি আকাশ থেকে পাঠান পানি।’’ তারপর এর দ্বারা আমরা উৎপাদন করি জোড়ায় জোড়ায় বিভিন্ন ধরনের গাছপালা।
তাহলে আমরাও আলবৎ তোমার কাছে নিয়ে আসছি এরই মতো জাদু, সুতরাং আমাদের মধ্যে ও তোমার মধ্যে একটি স্থানকাল ধার্য হোক যা আমরা ভাঙব না, -- আমরাও না আর তুমিও না, -- এক মধ্যস্থ জায়গায়।’’
মূসা তাদের বললেন -- ''ধিক্ তোমাদের! আল্লাহ্র প্রতি মিথ্যা আরোপ করো না, পাছে তিনি তোমাদের শাস্তি দিয়ে ধ্বংস করেন, আর যে মিথ্যা রচনা করে সে আলবৎ ব্যর্থ হয়।’’
তারা বলাবলি করলে -- ''এ দুজন নিশ্চয়ই তো দুই জাদুকর যারা চাইছে তাদের জাদু দিয়ে তোমাদের দেশ থেকে তোমাদের বিতাড়িত করতে, আর তোমাদের উৎকৃষ্ট আচার-অনুষ্ঠানকে বিনাশ করতে।
''আর তোমার ডান হাতে যা আছে তা ছোঁড়ো, এটি খেয়ে ফেলবে তারা যা বানিয়েছে। নিঃসন্দেহ তারা বানিয়েছে জাদুকরের ভেলকিবাজি। আর জাদুকর কখনো সফল হবে না যেখান থেকেই সে আসুক।’’
সে বললে -- ''তোমরা তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করলে আমি তোমাদের অনুমতি দেবার আগেই? সে-ই দেখছি তবে তোমাদের জাদুবিদ্যা শিখিয়েছে। কাজেই আমি নিশ্চয় তোমাদের হাত ও তোমাদের পা আড়াআড়িভাবে কেটে ফেলবই, আর আমি অবশ্যই তোমাদের শূলে চড়াব খেজুর গাছের কান্ডে, আর তোমরা অবশ্যই জানতে পারবে আমাদের মধ্যে কার দেওয়া শাস্তি বেশী কঠোর ও দীর্ঘস্থায়ী।’’
তারা বললে -- ''আমরা কখনই তোমাকে অধিকতর গুরুত্ব দেব না সুস্পষ্ট প্রমাণের যা আমাদের কাছে এসেছে ও যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন সে-সবের উপরে, কাজেই রায় দাও তুমি যা রায় দিতে চাও। তুমি তো রায় দিতে পার কেবল এই দুনিয়ার জীবন সন্বন্ধে।
''নিঃসন্দেহ আমরা আমাদের প্রভুর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছি, যাতে তিনি ক্ষমা করেন আমাদের অপরাধসমূহ আব যেসব জাদুর প্রতি তুমি আমাদের বাধ্য করেছিলে। আর আল্লাহ্ই সর্বশ্রেষ্ঠ ও চিরস্থায়ী।’’
আর আমরা অবশ্যই মূসার প্রতি প্রত্যাদেশ দিয়েছিলাম এই বলে -- ''আমার বান্দাদের নিয়ে রাত্রিকালে চলে যাও, আর তাদের জন্য সাগরের মধ্য দিয়ে একটি শুকনো পথ ভেঙ্গে চল, ধরা পড়ার আশংকা করো না, আর ভয় করো না।’’
হে ইসরাইলের বংশধরগণ! আমরা নিশ্চয় তোমাদের উদ্ধার করেছিলাম তোমাদের শত্রুদের থেকে, আর আমরা তোমাদের সঙ্গে একটি ওয়াদা করেছিলাম পর্বতের ডান পার্শ্বে, আর তোমাদের নিকট আমরা পাঠিয়েছিলাম মান্না ও সালওয়া --
''আমরা তোমাদের যা রিযেক দান করেছি তা থেকে ভাল ভাল বস্তু খাওয়া-দাওয়া করো, আর এতে সীমা ছাড়িয়ে যেও না, পাছে আমার ক্রোধ তোমাদের উপরে অবধারিত হয়ে যায়, আর যার উপরে আমার ক্রোধ অবধারিত হয় সে তো তাহলে ধ্বংস হয়ে যায়।
তখন মূসা তাঁর সম্প্রদায়ের নিকট ফিরে এলেন ত্রুদ্ধ ও ক্ষুদ্ধ হয়ে। তিনি বললেন -- ''হে আমার সম্প্রদায়! তোমাদের প্রভু কি তোমাদের সাথে ওয়াদা করেন নি এক উৎকৃষ্ট ওয়াদা? তবে কি প্রতিশ্রুত সময় তোমাদের জন্য দীর্ঘ মনে হয়েছিল, না তোমরা চেয়েছিলে যে তোমাদের প্রভুর শাস্তি তোমাদের উপরে অবধারিত হোক, যার জন্য তোমরা আমাকে দেওয়া ওয়াদার খেলাফ করেছ?’’
তারা বললে -- ''আমরা নিজেদের থেকে তোমাকে দেওয়া ওয়াদার খেলাফ করি নি, কিন্তু আমাদের উপরে লোকেদের অলংকারের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল আমরা সে-সব ফেলে দিই, আর এভাবেই সামিরী বাতলেছিল।’’
তারপর সে তাদের জন্য এক গরুর বাছুর গঠন করল -- এক কায়া মাত্র, ফাঁকা আওয়াজ ছিল তার, আর তারা বলেছিল -- ''এটিই তোমাদের খোদা ও মূসারও খোদা, কিন্তু তিনি ভুলে গেছেন!’’
আর অবশ্য হারূন এর আগে তাদের বলেছিলেন -- ''হে আমার সম্প্রদায়! নিঃসন্দেহ তোমরা এর দ্বারা সংকটের মধ্যে পড়েছ, আর তোমাদের প্রভু তো পরম করুণাময়, সেজন্য আমার অনুসরণ করো এবং আমার নির্দেশ পালন করো।’’
তিনি বললেন -- ''হে আমার সহোদর! আমার দাড়ি পাকড়ো না আর আমার মাথাও না, নিঃসন্দেহ আমি ভয় করেছিলাম পাছে তুমি বলো -- 'ইসরাইলের বংশধরদের মধ্যে তুমি বিভেদ ঘটিয়েছ এবং আমার কথার অপেক্ষা করো নি’।’’
সে বললে -- ''আমি দেখেছিলাম যা তারা দেখতে পায় নি, তাই আমি রসূলের পদচিহ্ন থেকে মুষ্টি-পরিমাণ মুঠোয় ধরেছিলাম, কিন্তু আমি তা বিসর্জন দিয়েছিলাম, আর আমার মন আমার জন্য এইভাবে করাটাই উপযুক্ত ঠাওরেছিল।’’
তিনি বললেন, ''তবে দূর হও, নিঃসন্দেহ তোমার জীবদ্দশায় তবে এটিই রইল যে তুমি বলবে, 'ছুয়াঁছুঁয়ি নেই।’ আর নিঃসন্দেহ তোমার জন্য রয়েছে একটি ওয়াদা -- তোমাদের জন্য কখনো তার খেলাফ হবে না। আর তোমার উপাস্যের দিকে তাকাও যাকে ঘিরে বসে থেকে তুমি পূজো করতে। আমরা অবশ্যই এটি পুড়ে ফেলব, তারপর নিশ্চয়ই এটিকে ছিটিয়ে দেব সাগরে ছুঁড়ে ছুঁড়ে।’’
সেইদিন তারা আহানকারীর অনুসরণ করবে, তাঁর মধ্যে কোনো আঁকানো-বাঁকানো নেই, আর গলার আওয়াজ হবে ক্ষীণ পরম করুণাময়ের সামনে, তারফলে তুমি মৃদু গুন ছাড়া আর কিছুই শুনবে না।
আর এইভাবেই আমরা এটি অবতারণ করেছি -- একখানি আরবী কুরআন, আর তাতে বিশদভাবে বিবৃত করেছি সতর্কবাণী- গুলো থেকে যেন তারা ধর্মপরায়ণতা অবলন্বন করে, অথবা এটি যেন গুণকীর্তনে তাদের উপদেশ দান করে।
কাজেই আল্লাহ্ অতি মহান, রাজাধিরাজ, চিরন্তন সত্য, আর কুরআন নিয়ে তুমি তাড়াতাড়ি করো না তোমার কাছে এর প্রত্যাদেশ সম্পূর্ণ হওয়ার আগে, বরং বলো -- ''আমার প্রভু! আমাকে জ্ঞান-বিজ্ঞান তুমি বাড়িয়ে দাও’’।
সুতরাং আমরা বললাম -- ''হে আদম! নিঃসন্দেহ এ তোমার প্রতি ও তোমার সঙ্গিনীর প্রতি একজন শত্রু, সে যেন বাগান থেকে তোমাদের বের করে না দেয়, তেমন হলে তুমি দুঃখকষ্ট ভোগ করবে।
কাজেই এ থেকে তারা খেল, সুতরাং তাদের লজ্জাস্থানগুলো তাদের কাছে প্রকাশ পেলো, তখন তারা নিজেদের ঢাকতে আরম্ভ করল সেই বাগানের পাতা দিয়ে। আর আদম তার প্রভুর অবাধ্য হয়েছিল, সেজন্য সে ভ্রান্তপথ ধরল।
তিনি বললেন -- ''তোমরা উভয়ে এখান থেকে চলে যাও -- সব ক’জন মিলে, তোমাদের কেউ কেউ অপরদের শত্রু। পরে তোমাদের কাছে আমার পক্ষ থেকে অবশ্যই পথনির্দেশ আসবে, তখন যে আমার পথনির্দেশ অনুসরণ করবে সে তবে বিপথে যাবে না ও দুঃখ-কষ্ট ভোগবে না।
এটি কি তাদের সৎপথ দেখায় না যে তাদের পূর্বে আমরা ধ্বংস করেছি কত জনপদকে যাদের বাসভূমিতে এরা বিচরণ করছে? নিঃসন্দেহ এতে তো নিদর্শন রয়েছে বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্নদের জন্য।
সেজন্য অধ্যবসায় অবলন্বন করো তারা যা বলে তাতে, আর তোমার প্রভুর প্রশংসার দ্বারা মহিমা জপে থাকো সূর্য উদয়ের আগে ও তার অস্ত যাবার আগে, আর রাত্রির কিছু সময়েও তবে জপতপ করো, আর দিনের বেলায়, যাতে তুমি সন্তষ্টি লাভ করতে পারো।
আর তোমার চোখ টাটিয়ো না তার প্রতি যা দিয়ে তাদের মধ্যেকার কোনো কোনো দম্পতিকে আমরা আপ্যায়িত করেছি -- দুনিয়ার জীবনের আড়ন্বর, যেন তার দ্বারা আমরা তাদের পরীক্ষা করতে পারি। আর তোমার প্রভুপ্রদত্ত রিযেক অধিকতর ভালো ও বেশী স্থায়ী।
আর তোমার পরিবারবর্গকে নামাযের নির্দেশ দাও আর তাতে লেগে থাকো। আমরা তোমার কাছ থেকে কোনো রিযেক চাই না, আমরাই তোমাকে রিযেক দান করি। আর শুভ পরিণাম তো ধর্মপরায়ণতার জন্য।
আর তারা বলে -- ''কেন সে তার প্রভুর কাছ থেকে আমাদের জন্য একটি নিদর্শন নিয়ে আসে না?’’ কী! তাদের কাছে কি পূর্ববর্তী গ্রন্থগুলোয় যা আছে সে সন্বন্ধে সুস্পষ্ট প্রমাণ আসে নি?
আর আমরা যদি এর আগে তাদের ধ্বংস করতাম শাস্তি দিয়ে তবে তারা বলতে পারত -- ''আমাদের প্রভু! তুমি কেন আমাদের কাছে একজন রসূল পাঠাও নি, তাহলে তো আমরা তোমার নির্দেশাবলী অনুসরণ করতে পারতাম আমাদের লাঞ্ছনা ভোগ করবার ও আমাদের অপমান অনুভবের আগেভাগেই?’’